পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (BIE) আয়োজিত "গ্রিন বিল্ডিং" শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত


পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট
, বাংলাদেশ (BIE) আয়োজিত "গ্রিন বিল্ডিং" শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

ঢাকা, ৮ এপ্রিল ২০২৬


টেকসই নির্মাণব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে ‘গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবিনার আয়োজন করেছে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (BIE)মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারটি সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ওয়েবিনারটির সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্ত ছিল GEM Consultant, 3C – Engineering & Research এবং Eco Design Consultants Bangladesh (EDCBD)এতে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন BIE-এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহামুদুর রহমান পাপন, যিনি একজন স্থপতি ও পরিবেশবিদ। বর্তমানে তিনি EDCBD এর প্রধান স্থপতি ও পরিবেশবিদ হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। তিনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর অর্থায়নে পরিচালিত সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (SREDA)-প্রণীত (BEEER - Building Energy Efficiency and Environment Rating) রেটিং সিস্টেমের আন্তর্জাতিক পরামর্শক দলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও বাংলাদেশে LEED সনদপ্রাপ্ত অসংখ্য গ্রীন ফ্যাক্টরী ডিজাইন এর কাজে জড়িত আছেন এক যুগের বেশি সময় ধরে।

ওয়েবিনারে গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণা, গুরুত্ব এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তা উল্লেখ করেন, গ্রিন বিল্ডিং এমন একটি নির্মাণ পদ্ধতি যা নকশা, নির্মাণ ও পরিচালনার প্রতিটি ধাপে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। বক্তা গ্রিন বিল্ডিংয়ের বহুমাত্রিক সুবিধা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন, যেখানে বলা হয় যে গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন ও নির্মাণ পদ্ধতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভব, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে শক্তি ও পানির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও পানির খরচ কমিয়ে ভবনের অপারেশনাল ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। উন্নত অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ফলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো, বায়ু চলাচল, কম দূষণ এবং আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় থাকে, যা ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও সুস্থতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া উন্নত নকশা, মানসম্মত নির্মাণ উপকরণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবনের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্স বৃদ্ধি পায়। গ্রিন বিল্ডিং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, পাশাপাশি এটি সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করে এবং টেকসই কমিউনিটি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বক্তা আরও উল্লেখ করেন যে, গ্রিন বিল্ডিং কেবল পরিবেশ রক্ষার একটি পদ্ধতি নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, জ্বালানি-দক্ষ এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন মডেল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই নির্মিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব কমিউনিটি গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ওয়েবিনারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা যেমন- LEED, BREEAM এবং EDGE -এর ওপর একটি সমন্বিত ও তুলনামূলক ধারণা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে এসব সিস্টেমের কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, ক্যাটাগরি ভিত্তিক স্কোরিং এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদীয়মান স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে HBRI প্রণীত  GreenARCH” এবং স্রেডা প্রণীত “BEEERরেটিং সিস্টেমের কাঠামো, কার্যপ্রণালী ও পয়েন্ট বণ্টন বিশদভাবে তুলে ধরা হয় । একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনগুলোর সাথে বাংলাদেশের স্থানীয় রেটিং ব্যবস্থার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে দেখানো হয় যে, বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করেও কীভাবে স্থানীয় জলবায়ু, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্মাণ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে একটি কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক গ্রিন বিল্ডিং মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

ওয়েবিনারে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রিন বিল্ডিং প্রসারে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তা উল্লেখ করেন যে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) অর্জন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ- এটি শিল্প কারখানাগুলোকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করে। একইভাবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (RAJUK) কর্তৃক ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR) প্রণোদনা গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে একটি কার্যকর প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে, যেখানে পরিবেশবান্ধব নকশা ও প্রযুক্তি অনুসরণকারী প্রকল্পগুলো অতিরিক্ত নির্মাণ সুবিধা পেতে পারে। তাছাড়া, গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে ব্যাংক ঋণের বিশেষ সুবিধা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-দক্ষ ভবন নির্মাণে অনেক ব্যাংক কম সুদের হার, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের সুযোগ এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন প্রদান করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন (Green Finance) নীতিমালার আওতায় এ ধরনের প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, ফলে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়াও তুলনামূলক দ্রুত হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ের মাধ্যমে অপারেশনাল খরচ কম থাকায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এসব সুবিধা গ্রিন বিল্ডিং খাতে বিনিয়োগকে আরও আকর্ষণীয় ও লাভজনক করে তুলছে। এসব উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে শিল্প ও নির্মাণ খাতে পরিবেশবান্ধব নকশা, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং টেকসই উপকরণ ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ওয়েবিনারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা “Building Energy Efficiency and Environment Rating - BEEER” রেটিং সিস্টেমের একটি বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপন, যা ভবনের সামগ্রিক পরিবেশগত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য একটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করে। বক্তা ব্যাখ্যা করেন যে, এই রেটিং সিস্টেমটি ভবনের নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ ও অপারেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে টেকসই নীতিমালা অনুসরণের মাত্রা পরিমাপ করে। BEEER-এর অধীনে ম্যানেজমেন্ট ও পরিকল্পনা ক্যাটাগরিতে প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা, অনুমোদন এবং দক্ষ পেশাজীবীর সম্পৃক্ততা মূল্যায়ন করা হয়; প্রজেক্ট সাইট ম্যানেজমেন্টে সাইট নির্বাচন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা ও তাপ দ্বীপ প্রভাব হ্রাসের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়; বিল্ডিং এনভেলপ ডিজাইনে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, ভবনের অভিমুখ ও প্যাসিভ ডিজাইন কৌশল গুরুত্ব পায়; ওয়াটার ম্যানেজমেন্টে পানির দক্ষ ব্যবহার, মিটারিং এবং পুনঃব্যবহার ব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হয়; এনার্জি ম্যানেজমেন্টে শক্তি সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; ইনডোর এনভায়রনমেন্ট কোয়ালিটি ক্যাটাগরিতে বায়ু চলাচল, আলোকসজ্জা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে; নির্মাণ উপকরণ ব্যবস্থাপনায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য, স্থানীয় ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার মূল্যায়িত হয়; স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ক্যাটাগরিতে নির্মাণকালীন ও পরবর্তী সময়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়; এবং ইনোভেশন ও বোনাস পয়েন্টের মাধ্যমে নতুন ও সৃজনশীল টেকসই সমাধানকে উৎসাহিত করা হয়। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে নির্ধারিত পয়েন্টের ভিত্তিতে একটি স্কেলে ভবনের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয় এবং অর্জিত স্কোর অনুযায়ী ভবনকে ৫টি ভিন্ন স্তরে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়, যা একটি প্রকল্পের টেকসই মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা নির্দেশ করে এবং দেশে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

পরিবেশবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলীসহ নির্মাণ খাতের বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য এই ওয়েবিনারটি একটি কার্যকর জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা গ্রিন বিল্ডিংয়ের নীতি, বাস্তবায়ন কৌশল এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেন, যা ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সামগ্রিকভাবে, ‘গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন ও সার্টিফিকেশন’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারটি একটি সময়োপযোগী, প্রাসঙ্গিক এবং ফলপ্রসূ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা দেশের নির্মাণ খাতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব চর্চা বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতীয়মান। এটি কেবল একটি জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা, সচেতনতা এবং পেশাগত দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (BIE) ভবিষ্যতেও এ ধরনের জ্ঞানভিত্তিক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করবে বলে আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সকল পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, নির্মাতা, এবং সচেতন নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট এর পশে থেকে এহেন উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রচারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ওয়েবিনারটির সফল সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

মন্তব্যসমূহ