পরিবেশবিদদের বাদ দিয়ে কোনো পরিকল্পনাই টেকসই হবে না

পরিবেশবিদদের বাদ দিয়ে কোনো পরিকল্পনাই টেকসই হবে না

পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (বাপই)
গত ৫ই জুন, ২০২৪ সারা বিশ্বে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের থিম হল "ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ এবং খরা প্রতিরোধ"। এই থিমের অধীনে, মূল ফোকাস হল ভূমির পুনরুদ্ধার, মরুকরণ রোধ এবং খরা প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ানো। এটি ইউএন দশক ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার (২০২১-২০৩০) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বৈশ্বিকভাবে বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং পুনরুজ্জীবনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। এই বছরের আয়োজক দেশ ছিলো সৌদি আরব। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ উপলক্ষ্যে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (বাপই), গতকাল বরাবরের মত "Bringing Nature Back to our Cities" শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। উক্ত সেমিনারে বাপই 'র নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সাধারণ সদস্যরা  উপস্থিত থেকে সেমিনারটিকে প্রাণের সঞ্চার জুগিয়েছেন এবং তাদের মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেছেন। সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে স্থপতি ও পরিবেশবিদ জনাব মোঃ মাহমুদুর রহমান পাপন তার সচিত্র উপস্থাপন তুলে ধরেন সদস্যদের মাঝে। উক্ত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাপই 'র সভাপতি প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদ জনাব এস এম খোরশেদ আলম সাহেব। সেমিনারে মূল উপস্থাপনের উপর মতামত প্রদান করেন পরিবেশবিদ জনাব ইকরামুল হক, জনাব মুহাম্মদ গালিব হোসাইন, জনাব শরীফ নূর শাম্স, জনাব ওয়াকিল আলম, জনাব মোঃ মাহাবুব মন্ডল, প্রমুখ। সদস্যদের অনুরোধে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সকল সদস্যদের মাঝে সেমিনারের তথ্যগুলো দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার লক্ষে বাপই 'র অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সেমিনারের মূল উপস্থাপনটি লাইভ করা হয়েছিল। 
ছবিঃ প্রধান বক্তা ও সভাপতি সহকারে সেমিনারে উপস্থিত সদস্যদের একাংশ।

সেমিনারে অংশগ্রহনকৃত বেশিরভাগ পরিবেশবিদরা বিশ্বাস করেন, নগরায়নের কারণে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের চাপে শহরগুলোতে সবুজ পরিবেশের অবক্ষয় একটি সাধারণ ঘটনা। তবে শত উন্নয়নের মাঝেও শহরে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার না, বরং মানুষের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যকেও উন্নত করা সম্ভব।

মূল বক্তা তার উপস্থাপনে শহরে সবুজায়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেন, শহুরে জীবনের চাপে ক্লান্ত মানুষদের জন্য উদ্যান, পার্ক এবং সবুজ এলাকা মানসিক স্বস্তি এনে দেয়। আবার গাছপালা এবং উদ্ভিদ বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফলে শহরের বায়ু মান উন্নত হয় এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকি কমে। তাছাড়া গাছপালা এবং সবুজ স্থান শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমগ্র পৃথিবীর জলীয় বাষ্পের ১০% বায়ুমন্ডলে ট্রান্সপিরেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায় যা বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা শুধুমাত্র উদ্ভিদের মাধ্যমেই সম্ভব। সবুজ ছাদ এবং পার্কগুলো শহরের "হিট আইল্যান্ড" প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।

মূল বক্তা শহুরে পরিবেশে প্রকৃতিকে পুনঃপ্রবর্তনের জন্য অসংখ্য কৌশল বাস্তবায়নের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। এই কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে সবুজ অবকাঠামো নির্মাণ, বন এবং সবুজ স্থান সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য-বান্ধব ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করা, জল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা অনুশীলন করা। উপরন্তু, সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন কৌশলের বাস্তবায়ন যেমন সবুজায়ন নীতি প্রণয়ন, প্রণোদনা প্রদান, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচী প্রদান এবং পরিবেশগত প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন প্রচার এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ।

আজ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বিশ্ব, যেখানে গাছ লাগানো একটি শক্তিশালী সমাধান। গাছ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, জীববৈচিত্র্যকে লালন করতে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, CO2 শোষণ করতে, ভূগর্ভস্থ জলের মজুদ বাড়াতে, বায়ু ও জলের গুণমান উন্নত করতে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে "প্রকৃতিকে শহরে ফিরিয়ে আনা" উদ্যোগটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শহরের প্রতিটি কোণে প্রকৃতির ছোঁয়া ফিরিয়ে আনা এবং বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও সবুজ পরিবেশ তৈরি করা। "প্রকৃতিকে শহরে ফিরিয়ে আনা" উদ্যোগটি শুধুমাত্র একটি শৌখিন প্রয়াস নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জরুরি প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন পরিবেশ পরিকল্পনা যা পরিবেশবিদদের দ্বারা সাধিত হয়। পরিবেশ বাদ দিয়ে কোনো পরিকল্পনাই টেকসই ও জনবন্ধন হবেনা। ভবিষ্যতে চাকরীর বাজারেও যেন এর প্রভাব পড়তে পারে সেই লক্ষ্যে পরিবেশবিদ ক্যাডার এবং পরিবেশবিদ পরামর্শক তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এটি শুধুমাত্র পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং মানুষের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং শহরগুলোতে প্রকৃতির উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা একটি টেকসই এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি। আমাদের সকলের উচিত এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা এবং শহরগুলোকে আরও সবুজ, স্বাস্থ্যকর এবং বাসযোগ্য করে তোলা। শুধুমাত্র তখনই আমরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে সত্যিকারের শান্তি এবং সুস্বাস্থ্য অর্জন করতে পারব। মরুকরণ রোধ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষ রোপণ অপরিহার্য। 

মন্তব্যসমূহ